সোহম দাস
মুদ্রার একটা উল্টোপিঠ থাকে, থাকেই!
শেষ ল্যাপ, আশি মিটার আর বাকি। অস্ট্রেলিয়ার এলা কনোলিকে টপকালো মেয়েটা, তারপর রোমানিয়ার আন্দ্রেয়া মিকলসকে, আর শুধু বাকি আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলিট টেলা, ঝাঁকড়া চুলের টেলা ম্যানসন। ‘শি ক্যান সি দ্য লাইন, শি ক্যান সি হিস্ট্রি’। কমেন্টেটরের গলায় ছেলেমানুষী উত্তেজনা। আমরা তখন ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া-বেলজিয়ামের বৈপ্লবিক ফুটবল আর ব্রাজিল-জার্মানি-আর্জেন্তিনার ভরাডুবি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। বিশ্বমঞ্চে ভারতের হয়ে অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকের প্রথম সোনাটা এনে দিল অসমের একটা সদ্য-আঠেরো পেরনো মেয়ে। ভিডিওটা ছড়িয়েছিল, যৎসামান্য। আর এদিক-ওদিক লেখালেখি। তার যতটা হিমার প্রশংসা করতে, তার চেয়ে বেশি ক্রিকেটকে তুলোধনা করতে, তার বাবা ধানচাষী এ ব্যাপারটাকে আরও বেশি করে গ্লোরিফাই করার উদ্দেশ্যে। কদিনকার চলা গিমিক। আচ্ছা, আমরা খোঁজ রাখছি তো এখন হিমা দাস কীভাবে নিজেকে তৈরি করছে, তার পরবর্তী লক্ষ্য কী, এসবের ব্যাপারে জনমানসে বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে তো?
হিমার সাফল্যের কিছুদিন বাদে আরেকটা মেয়ে। মাড়ির যন্ত্রণায় গালজোড়া ব্যান্ডেজ বেঁধে হেপ্টাথলনের মত ইভেন্টে গোল্ড। তাও এশিয়ান গেমসের মত মঞ্চে। খবরের কাগজ জুড়ে অজস্র লেখালেখি, সাথে বিশেষ বিশেষ ফোটো। কোনোটায় ওর দুপায়ের মোট বারো আঙুলের ক্লোজ-আপ, কোনওটায় জলপাইগুড়ির অদূরে ঘোষপাড়ায় ওর মায়ের ছবিতে আনন্দাশ্রু। হেডলাইনে উঠে আসছে টিনের ঘর, এবড়োখেবড়ো উঠোনের রসালো বর্ণনা। ‘আহা, কী কষ্ট করে উঠে এসেছে গো মেয়েটা’! ইন্দোনেশিয়াতেই রয়েছে তখনও মেয়েটা, তর সইল না টালিগঞ্জের পরিচালকের। বায়োপিক তৈরির প্রস্তাব চলে গেল স্বপ্না বর্মণের কাছে! ঠিক আছে, সব মানা গেল। প্রতিকূলতাকে জয় করে মেয়েটা সত্যিই করে দেখিয়েছে। অবশ্যই মোটেভেশনাল। কিন্তু আমরা আদতে কীসে ইন্টারেস্টেড, তার ওই সাতটা স্পোর্টসের ব্যাপারে, নাকি তার ব্যাকগ্রাউণ্ডের ব্যাপারে? মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে আমরা আদৌ জানি তো, হেপ্টাথলনে কি কি খেলা ইনক্লুডেড থাকে বা স্বপ্না কোন খেলাটায় কত পয়েন্ট পেয়ে সার্বিকভাবে সকলকে হারিয়েছে? সোনাজয়ের পর স্বপ্না বর্মণ বলেছিল, দু-পায়েই ছয় আঙুল থাকার কারণে সাধারণ জুতোতে খুব অসুবিধেয় পড়তে হয়, এবার আশা করি স্পেশাল জুতো বানানোর ব্যবস্থা হবে, সেটার খবর রেখেছি কি আমরা?
দুবছর আগের আরেকটা মেয়ের কথা বলব। ১০ই আগস্ট, ২০১৬! সকল ভারতবাসীর চোখ সেদিন টিভির পর্দায়, ইন্টারনেট ব্রাউজারে। প্রথম ভারতীয় আর্টিস্টিক জিমন্যাস্ট হিসাবে সেদিন অলিম্পিক্সে ভল্ট ফাইনাল খেলছে দীপা কর্মকার। দারুণ খেলে শেষপর্যন্ত ফোর্থ পজিশন, অল্পের জন্য পদকটা মিস হল। কিন্তু যে প্রোদুনোভা ভল্টটাকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল মেয়েটা, সেই প্রোদুনোভাটা করতে গিয়েই এক্সিকিউশনে পয়েন্ট খোয়ানো। ওটা যদি ঠিকঠাক হত আরেকটু... তারপর পদ্মশ্রী, রাজীব গান্ধী খেলরত্ন, সচিন টেন্ডুলকরের পক্ষ থেকে বিএমডব্লিউ উপহার-সবই ছিল! ফিফথ উওম্যান ইন জিমন্যাস্টিক্স হিস্ট্রি টু পারফেক্টলি এক্সিকিউট দ্য প্রোদুনোভা ভল্ট। এই স্ট্যাটিস্টিক্সটা আমরা জেনে গিয়েছি ততদিনে! দীপার সহ-প্রতিযোগী সোনাজয়ী সিমোনে বাইলস অবধি দীপাকে দিয়েছে দরাজ সার্টিফিকেট-কর্মকার ইজ ক্রেজি! আমি কখনওই প্রোদুনোভা করতে যাব না! আমরা জেনে গেলাম, প্রোদুনোভাটা একটা বিশাল কিছু ব্যাপার, কেউ কেউ জানলাম এটা সবথেকে কঠিন ভল্ট, ডিফিকাল্টি পয়েন্ট ৭। এরপর চোট-আঘাতে জর্জরিত হয়েছে দীপা! কিছুদিন আগে অ্যান্টিরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট টিয়ারের শিকার হল, কমনওয়েলথে যেতে পারেনি। যেকোনো খেলোয়াড়ের কাছেই এই চোটটা কেরিয়ারঘাতী, সেখান থেকে ফিরে এসে এফআইজির ওয়ার্ল্ড চ্যালেঞ্জার্স কাপে গোল্ড জিতল আবার। আমরা তো এই ধরনের মশলাদার গল্প পছন্দ করি, কিন্তু কোথায়, আর তো সেরকম প্রচার হতে দেখলাম না! আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্সে কোনও গ্লোবাল ইভেন্টে ভারতকে প্রথমবার সোনা এনে দিল দীপা-এই ইতিহাস নিয়ে এখন তো আর মাতামাতি নেই!
উইমেন’স ক্রিকেট টিম। তবু এখন কিছুটা লাইমলাইটে থাকে! ক্রিকেট বলেই হয়ত! মিতালি রাজের ব্যাটিং পরিসংখ্যান ঈর্ষা করার মত। সেসবের খবর রাখি না! ঝুলন গোস্বামী, উফ দারুণ বোলার, বাঙালির গর্ব! আচ্ছা, ঝুলন গোস্বামী কটা উইকেট পেয়েছেন? উঁহু, সেসব জানার কোনও প্রয়োজন নেই! ২০১৭ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপে একদম তীরে এসে তরী ডুবল, শেষ সাতটা উইকেট পড়ে গেল তিরিশেরও কম রানে। একটু ধৈর্যশীল হলে ম্যাচটা বেরিয়ে যেত, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কাপটাই মাঠে ফেলে এল দল! নাঃ, সমালোচনা হয়নি, একটুও! বরং প্রশংসায় ভরিয়ে দেওয়া ছিল! ‘গার্লস, ইউ মেড আস প্রাউড!’ অথচ এরই এক-দুমাস আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সারা টুর্নামেন্ট দুর্দান্ত খেলে এসে ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে গো-হারান হারল মেন’স টিম। খিস্তিখেউড়, সমালোচনা, সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং! অতটা নোংরামো কোথাওই কাম্য নয়, তাও ছেলেদের বেলায় যেখানে এতকিছু হয়, সেখানে নিশ্চিত জেতা ম্যাচ স্রেফ হারাকিরি করে হারল মেয়েরা, তাদের নিয়ে ‘ইউ মেড আস প্রাউড’, ‘ওয়েল ডান গার্লস’! হারটা নিয়ে আমাদের কোনও বিশ্লেষণ হল না, আমরা মারাত্মক কিছু মুষড়েও পড়লাম না! না, এসব হবে না, কারণ এখানেও প্রচ্ছন্ন স্টিরিওটিপিক্যালিটি। আহা, মেয়েরা ফাইনালে উঠেছে এই তো অনেক-এমন একটা ধারণা কাজ করছে! অর্থাৎ ছেলেরা ফাইনাল খেলবে এ জানা কথাই আর মেয়েদের ফাইনালে ওঠাটা আমাদের কাছে বিয়ন্ড এক্সপেক্টেশনের মত একটা ব্যাপার! খবর রাখলে তো জানতাম, টুর্নামেন্টে গ্রুপ স্টেজে সাউথ আফ্রিকা আর অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটা বাদ দিলে প্রতিটা ম্যাচে কীরকম ডমিনেটিং স্টাইলে ম্যাচগুলো জিতেছিল ভারত! নাঃ, সেসব জানার প্রয়োজন সত্যিই নেই!
দীপার পদ্মশ্রী পাওয়া নিয়ে এক ক্রীড়াপ্রেমী প্রশ্ন তুলেছিলেন তখন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যতই ভালো খেলে থাকুন, পদক পাননি! অবশ্যই পদক পাওয়া কী না-পাওয়া খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ মানদণ্ড নয়! সেটা তর্কের বিষয়! কিন্তু এই যে কেউ কিছু একটা অর্জন করলেই সাথে সাথে ঘোষণা করা আর্থিক পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় সম্মান-এগুলো কোথাও গিয়ে কী বড্ড সংকীর্ণতা এনে দেয় না? পুরস্কার দেওয়া হল, কী একটা চাকরি-তারপরেই রাষ্ট্রের দায় শেষ, এবার তুমি কী করবে করো গে যাও! হ্যাঁ, আর্থিক পুরস্কার অনেকটা হয়ত স্বচ্ছলতা দেয় খুব দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এইসব খেলোয়াড়দের, কিন্তু এগুলোর বিপরীতমুখী প্রভাবটা তো সহজে অস্বীকার করা যায় না। স্বপ্নার ট্রেনার সুভাষ সরকার বায়োপিকের ব্যাপারে বিরুদ্ধমত দিয়েছেন। তাঁর মতে, এখনই এসব হলে মেয়েটার নিজের খেলায় মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যেরকম হয়েছিল গীতা আর ববিতা ফোগতের বা মেরি কমের! আসলে আমরা আগে সিনেম্যাটিক এলিমেন্ট চাই, আমাদের আগে হেডলাইন চাই, তাই টিনের ঘর থেকে উঠে এসেছে স্বপ্না বর্মণ বা ধানক্ষেতের পাশ থেকে উত্থান শুরু হিমা দাসের বা স্কুটারের ভাঙাচোরা অংশ দিয়ে অনুশীলন করত দীপা, মুখরোচক এসবের প্রতি আমাদের বাড়তি আগ্রহ! এগুলো যত না বাকিসব উঠতি খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে, তার চেয়ে বেশি নিজস্ব ব্র্যান্ড-ভ্যালু বাড়াতে! আর মেয়ে হলে তো কথাই নেই, তার জন্মের সময় থেকে যত খুঁটিনাটি তথ্য সব খুঁজে বার করবে সংবাদমাধ্যম! সাক্ষী মালিককে মনে আছে? রিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতার পর মিডিয়ার হাইপ, সেই উজাড় করে দেওয়া পুরস্কার, রিওর পরে আরও বেশ কয়েকটি পদক জিতেছেন, তার মধ্যে জোহানেসবার্গ কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা, গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ, কিন্তু সেই ফর্ম ধরে রাখতে পারেননি! আগে চটকদারিতে না গিয়ে আমরা যদি খেলাগুলোর ভেতরে ঢুকে একটু চিন্তা করতাম...
তবে এবার একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি! ভারতীয় ফুটবলে ফিফার বরাদ্দ টাকার মাত্র পনেরো শতাংশ দেওয়া হয় মহিলা ফুটবলে! আজ্ঞে জানিয়ে রাখি, মহিলা ফুটবল দলের ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং বর্তমানে ৬০, ২০১৩ তে ৪৯ র্যাঙ্কিং করেছিল! বালা দেবী গাঙ্গোম, মণিপুরের মেয়ে, ক্যাপ্টেন, ৪১টা ম্যাচে ৩২টা গোল। কমলা দেবী ইয়ামনাম, ওই মণিপুরেরই, ৩১ ম্যাচে ২৬ গোল। দুজনেই ফেডারেশনের বর্ষসেরা মহিলা ফুটবলার হয়েছেন। এদিকে অর্ধেক মাঠে মেয়েগুলোর জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো অবধি নেই, নেই ভালো স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও! এদের নিয়ে ওই লেখালেখিটুকুও দেখতে পাই না তো! বরং ফুটবলেরই কর্তামশাই সাতবার লিগে পরাজয়কে কন্যাসন্তান জন্মানোর সাথে তুলনা করে বসেন, অম্লানবদনে! আরও আছেন, কয়েকজন! খেলার স্বপ্নটা খেলার মাঠেই ফেলে এসেছেন, রাদার বাধ্য হয়েছেন ফেলে আসতে। আন্ডার নাইন্টিন এবং সিনিয়র ফুটবলেও রাজ্যকে জেতানো ওড়িশার রেশমিতা পাত্রের পানের দোকান চালানো কিংবা স্পেশাল অলিম্পিকে ২০০ আর ৪×৪০০ মিটার রিলেতে একসময় দু-দুটো ব্রোঞ্জ মেডেল জিতে আসা মধ্যপ্রদেশের সীতা সাহুর ফুচকা তৈরি কিংবা সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপে রূপো, ব্যাঙ্কক গ্রাঁ প্রিতে ব্রোঞ্জ, তাইওয়ান এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রূপো জিতে আসা নিশারানী দত্তের ঘর বাঁচাতে কোরিয়ান কোচের কাছ থেকে উপহার পাওয়া রূপোর তীর-ধনুক বেচে দেওয়া। স্টেট গভর্ণমেন্ট রেশমিতাকে কোনও সাহায্য করেনি, মধ্যপ্রদেশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী দুটো ব্রোঞ্জ মেডেলের জন্য এক লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল সীতার, নিশারানী চেষ্টা করেও কোনও ব্যাঙ্কলোন পাননি-মশলা চাই তো আমাদের, এগুলো নিয়ে তাহলে কেন সিনেমা হতে পারে না?
মুদ্রার একটা উল্টোপিঠ থাকে, থাকেই!
ঋণ-অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ, প্রসার ভারতী, বোলপুর।
মন্তব্যসমূহ